জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা দিবস


                         আজ আবার সেই ১৫ ই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস।  প্রতিবছর যখনই এই দিনটি আসে, তখনই আমার সেই ছোটবেলাকার কথাটা খুবই মনে পড়ে।  আমরা দুই বোন, কিন্তু সেই ছোটবেলার কথা বোনের অত মনে আছে কিনা জানিনা, কারন তখন বোন খুবই ছোট ছিল। আমি তখন ক্লাস ফোরে,  ফাইভে উঠবো। নতুন স্কুলে যাওয়ার আনন্দ আমার। বোন সবেমাত্র ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হবে। নানা অভাব-অনটনের মধ্যেও মা কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। সাধ্যমত আমাদের সবাইকে ভালো রেখেছে।


                             উঠোনে মার হাতে লাগানো অনেক রকম সবজি হত। বাবা খুব অসুস্থ থাকায় উঠোনের এই সব সবজি বিক্রি করে আর মেশিনে সেলাই করে কোনোক্রমে মা সংসারটা ধরে রেখেছিল। লাউ, কুমড়ো, বেগুন, টমেটো, লঙ্কা, শাকসবজি, সজনে এইসব গাছের মধ্যে নিকানো উঠোনের একপাশে ইটের উপর ইট সাজিয়ে নিজের হাতে তৈরি নিকানো পরিপাটি একটা তুলসী মঞ্চ ছিল মার একান্ত আপনার, আর খুব ভালোবাসার জায়গা। নিকানো উঠোনে তুলসী মঞ্চের সামনে মা প্রতি বৃহস্পতিবার খুব যত্নে আলপনা দিত।প্রতিদিন তুলসী মঞ্চের গোড়ায় জলদিত আমার মা।

                           

                              মা মারা যাবার পর আর তুলসী গাছে সেভাবে জল ঢালা হয় না, যত্ন করা হয় না।চাকরির জন্য আমাদের দু বোনের সময় কোথা দিয়ে চলে যায়। বাবা অনেক আগেই মারা গেছে এবং মা সবে মাত্র দু'বছর হলো মারা গেছে। মা মারা যাবার পর থেকেই ঘরদোর, গাছ-পালা সবাই যেন অবহেলায় অযত্নে জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। শাক-সবজি, ফলমূল গাছ আর নেই, তুলসী গাছটাও অবহেলায়, অযত্নে অর্ধমৃত অবস্থায়।


                            আবার বন্দেমাতারাম ধনী উঠলো- রাইমোহিনী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন হচ্ছে। তারপর জনগণমন জাতীয় সংগীতে মুখরিত হবে গোটা স্কুলটা। এরপর হেডস্যার স্বাধীনতা দিবস সম্বন্ধে কিছু বলবেন। সর্বশেষে চকলেট বিতরণ। এই চকলেট একটা বেশি পাবার আশায় কি মরিয়া চেষ্টা ছিল তখন।  চকলেট পেলেই বাড়িতে দৌড়।বোনকে দিতাম একটা। আর একটা বেশি পেলে আমি আর মা ভাগ করে খেতাম। মাকে না দিতে পারলে আমার খুব কষ্ট হতো। এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের প্রথম পড়াশুনা।


                               বাবা আমাদের ছোটবেলায় মারা যাওয়ায় মাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। মা সারাদিন মেশিনে সেলাই করতো। ঘামে ভেজা মায়ের সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের করুন মুখটা দেখলে আমার খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আমরা দুজনেই খুব ছোট তাই কষ্ট হলেও কিছুই করতে পারতাম না।মা সারাদিন মেশিন চালাত আর সেলাইয়ের যেগুলো কাটছাঁট টুকরো-টাকরা বেঁচে থাকত সেগুলো দিয়ে বালিশের ওয়াড় ছোটখাটো জিনিসপত্র আমার হাতের ছোঁয়ায় যেন সুন্দরভাবে তৈরি হয়ে উঠত। সেলাই করার ফাঁকে ফাঁকে মা মাঝে মাঝে আমাদের নাম ধরে ডাকতো- মিলি, কলি  তোরা কোথায় গেলি? সন্ধ্যে হয়ে গেল এখনো পড়তে বসলি না? স্কুলে আমার নাম ছিল মিতালী, বোনের নাম কাকলি। আমি ইস্কুলে বরাবর ফার্স্ট হতাম, তাই স্যারেরা আমাকে খুবই ভালবাসতেন।


                               রাইমোহিনী প্রাথমিক বিদ্যালয় আমাদের বাড়ির পাশে, তাই আমি একা একাই স্কুলে যেতাম। সেবার আমি ফোর থেকে ফাইভে উঠবো, বোন ক্লাস ওয়ানে এই স্কুলেই ভর্তি হবে। কয়েকদিন থেকেই মাকে বলে রেখেছি- এবার আমাদের ১৫ ই আগস্টে দুটো নতুন জামা দিতে হবে। রোজ রোজ স্কুলড্রেস নয়তো ছেড়া জামা পড়ে যেতে একটুও ভালো লাগে না। বন্ধুরাও খুব হাসাহাসি করে, আমাদের দেখে। তাছাড়া এবার ১৫ ই আগস্টে আমাদের স্কুলে যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতা হবে। সবাই সুন্দর সুন্দর জামায় সাজবে বলেছে ওই দিন। অনেকে আবার ড্রেস ভাড়াও নেবে বলেছে। মার ঘামে ভেজা ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকালে খুবই কষ্ট হয়, কোন কিছু চাইতে ইচ্ছে করে না। তবুও আমি বায়না করতেই থাকি। বায়না করি অবুঝের মতো। কি করব ছেড়া জামা পড়ে গেলে যে সবাই হাসাহাসি করে। সবাইতো আর বোঝেনা আমরা কত গরিব। কত কষ্ট করে মাকে আমাদের সংসারটা চালাতে হয়।


                                সকাল থেকে আমরা দুই বোন মার মেশিনের সামনের ঠায় দাঁড়িয়ে আছি আর মাকে মাঝে মাঝে তাগাদা লাগাচ্ছি মার জামাটা তৈরি হলো কিনা। কখন হবে আমাদের নতুন জামা আর দেরি করতে পারছিনা। ওদিকে মাস্টারমশাই পতাকা তুলে ফেলবেন। মা মাঝে মাঝে বলছে, আর একটু দাঁড়া মা- এই হয়ে গেল। আমি বলি- আর দাঁড়ালে পতাকা তুলে ফেলবেন মাস্টারমশাই।  চকলেট ও সবাইকে দেওয়া হয়ে যাবে। আর একটু ও  দাঁড়াতে পারবো না আমরা। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হল….. মার হাতে তৈরি বহু কষ্টের জামা আমরা পরলাম। সেই জামাতে নিজেদেরকে যেন সেরা মনে হতে লাগল। হোকনা জোড়া তালি দেওয়া ফ্ল্যাগের কালারের মত, তবুওতো নতুন জামা। মায়ের হাতে তৈরি বহু কষ্টার্জিত শ্রমের ফল। এতদিন তো ছেঁড়াফাটা জামাতে ওরা দুই বোন অভ্যস্ত ছিল।মা লোকের বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে যে জামা এনে দিয়েছে সেই জামাই তো ওরা দুই বোন ভালোবেসে পড়েছে। আর স্কুল থেকে একটু স্কুলড্রেস দেয়। আজকে মা গেরুয়া, সাদা, সবুজ তিন রং দিয়ে আমাদের জামা বানিয়ে দিয়েছে। কি সুন্দর দেখতে হয়েছে জামাগুলো। মাঝখানে সাদা ছিটের উপর নীল রঙের বড় একটা বোতাম লাগিয়েছে মা, তাতে যেন বোতামটাকে মনে হচ্ছে অশোক চক্র একটা। দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ছিট কাপড় থেকে মা বুদ্ধি করে কি সুন্দর জামা বানিয়ে দিয়েছে।


                               আজ আর কেউ হাসাহাসি করবে না। কতদিন পরে নতুন জামা পরেছে। নতুন জামার গন্ধই একটা আলাদা। বোনের হাত ধরে তাড়াতাড়ি স্কুলের পথে পা বাড়ায় মিতালী। পতাকা তুলে ফেললে আর চকলেট পাওয়া যাবেনা। বোন এই বছর ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হবে, ওকেও একটু স্কুলটা চেনানো দরকার- না হলে ভর্তির প্রথম দিনটা একটু ভয় ভয় করবে।


                             এক ছুটে দুই বোনের স্কুলে ঢোকে। না ঠাকুরের কৃপায় এখনো পতাকা উত্তোলন হয়নি। আজকে আবার যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতা হবে। কে কেমন  সাজবে কে জানে, সবাই তো নিশ্চয়ই খুব সুন্দর সাজবে। পাশ দিয়ে পল্টু যাচ্ছিলো। বড়লোকের গোয়ার-গোবিন্দ ছেলে।চ্যাটাং চ্যাটাং কথাবার্তা সবসময়। ওদের দেখে মুখ ভ্যাংচিয়ে বললো- তোরা কি বাউল সাজবি নাকি ? তাপ্পি মারা বাউলের মতো ড্রেস পড়েছিস ? এই ড্রেস পরেই কি কম্পিটিশনে নাম দিবি? হেডস্যার পল্টুর দিকে কটমট করে তাকিয়ে জোর ধমক দিতে ও চলে যায়।


                                 পতাকা তোলা হলো, জাতীয় সংগীত সবাই মিলে গাইলাম। চকলেট বিতরণ হলো।বোন ছোট তাই ও চকলেটটা খেলেও আমি আমার চকলেটটা মার জন্য জামার পকেটে রাখলাম সযত্নে। বাড়িতে গিয়ে মাকে চকলেটটা দেব।


                      এরপর শুরু হলো যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতা। সবাই কত কি সেজেছে- কেউ বর-বউ, কেউ বড়লোকের ছেলে, পাগল, সন্ন্যাসী, শিব, স্বাধীনতা সংগ্রামী এইরকম  আরো কত কি সবাই সেজেছে।সর্বশেষে মিতালী, কাকলির ডাক পড়লো। বিচারক খুব খুঁটিয়ে পোশাক গুলো দেখলেন। এত ছোট ছোট কাপড় জোড়া দিয়ে যে এমনভাবে হাতে জামা তৈরি করা যায় তা চোখে না দেখলে ভাবা যায় না। আবার জামার মাঝখানে নীল বোতামে অশোক চক্র যেন শোভা পাচ্ছে। দারুন আইডিয়াটা। বিচারক অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পরে বললেন- যার মাথা থেকে এ ভাবনাটা বেরিয়েছে তার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না। বাচ্চারা সবাই যে যার নিজস্ব সাজে সুন্দর, কিন্তু সবাই ভাড়া নেওয়া বা কেনা পোশাকে সুন্দর সেজেছো। কিন্তু এই ১৫ ই আগস্টের বিশেষ দিনে ফ্ল্যাগের তিন কালারে সুসজ্জিত মিতালী এবং কাকলি আজকের বিজয়িনী। আজকে যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতায় ওরাই প্রথম হয়েছে। আর এই প্রথম হওয়ার পিছনে যার হাত,  যার হাত দিয়েই এই সুন্দর পোশাকগুলো তৈরি হয়েছে, তিনিও আজকে উইনার। তাকেও আমরা আমাদের স্কুল থেকে কিছু টাকা তার হাতে তুলে দেব।


                              আমাদের অনুষ্ঠান দেখতে মা ছুটে এসেছিল। মার সেই শিরা ওঠা, শক্ত হাতে হেডস্যার তার বিচারক যখন টাকাটা তুলে দিলেন, মার জল ভরা চোখের সেই হাসিটা আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ হাসি বলেই মনে হলো।


                                     টুকরো টুকরো নানা স্মৃতি আজও নানা সময়ে মনের মাঝে উঁকি দেয়। উঠোনের দিকে তাকালে, বিশেষ করে মার হাতে লাগানো গাছগুলোর দিকে তাকালে মার স্মৃতি ভীষণভাবে মনে পড়ে। সারাদিনের পরিশ্রমে মার রুক্ষ, ক্লান্ত শরীরের মতোই যেন উঠোনটাও আজ অযত্নে রুক্ষ হয়ে গেছে। আজ আমরা জীবনে প্রতিষ্টিত- গাছপালা, উঠোন, তুলসী মঞ্চ পরিচর্যা করার সময় খুবই কম, তবুও আজও সযত্নে রক্ষিত আছে আমাদের ছোটবেলাকার সবুজ রঙের টিনের বাক্সটা। যার মধ্যে অতি সযত্নে মার রাখা আমাদের দুই বোনের ফ্ল্যাগের কালারের সেই জামা দুটো, যা ন্যাপথলিনের মধ্যে অতি সযত্নে রাখা আছে। আজও আমরা বাক্সটা অতি যত্নে রক্ষা করে রেখেছি, হয়তোবা সারা জীবনই মায়ের ভালোবাসা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওই জামা দুটো সযত্নে রক্ষা করে রাখবো।

Comments

Popular Posts