আসছে বছর আবার হবে-

   মা' র উনুন তৈরী করার মাটি থেকে একটু একটু মাটি সরিয়ে কখনও পুতুল, কখনও খেলনা বাটি , আম,কলা, পটল ইত্যাদি থেকে  কখন যেন আপনা আপনিই  বিভিন্ন ঠাকুরের মূর্তি তৈরী হয়ে যেত, ছোট বেলায়। এগুলি ছিলো আমার খেলার নিত্য সঙ্গী। মাটি দিয়ে ছোট ছোট ঠাকুর তৈরী করতে করতে একবার কেমন করে, যেন দূর্গা ঠাকুর তৈরী করে ফেললাম। দূর্গা প্রতিমার সরকিছু মোটামুটি যাওবা হলো,তবে প্রতিদিন মৃৎ- শিল্পীর বাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিদর্শন করে ও সিংহর মুখটা কিছুতেই যেন আয়ত্বে আনতে পারলাম না। মোটামুটি   গোঁজামিল দিয়ে কোনো রকমে সিংহের অবয়ব সম্পূর্ণ হলো।মা' র ছেঁড়া শাড়ি তে কাদা মাটি মাখিয়ে সব প্রতিমার শাড়ী সম্পূর্ণ হল।

মা' র পুরানো টার্সেল  কেটে সবার চুল তৈরী- ও করা হলো। হলুদ, কয়লার গুঁড়া, ইট এর গুঁড়া, আলতা, কাপড়- জামায় দেওয়া রবিন ব্লু দিয়ে মোটামুটি রং- ও সম্পূর্ণ হলো।কিন্তু সমস্যা হলো পশুরাজ সিংহের  কেশর নিয়ে ! যত ঝামেলা এই সিংহ কে নিয়ে।অনেক ভেবে চিন্তে সমস্যার সমাধান করা গেলো। ভুট্টার মাথার যে কেশর থাকে ,তাই দিয়ে। বাড়িতে আনা ভুট্টার মাথার কেশর কেটে তৈরী হলো পশুরাজ সিংহ -এর কেশর। হাফ ছেড়ে বাঁচা গেল।


তারপর, মা'র শাড়ী, বাবার ধুতি দিয়ে তৈরী হলো প্যান্ডেল।  বাতাসা, নকুলদানা দিয়ে পূজা- ও সম্পূর্ন হলো। এই ছিল আমার ছোটবেলার খেলার ধরণ।


তবে ছোটবেলায় ক্লাবের পূজাতে আলাদা একটা উন্মাদনা ছিল-,প্যান্ডেল হওয়া থেকে পূজা পর্যন্ত, সব কিছুতেই। তখন স্নান ,খাওয়া ঘুমও উঠে যেত। অতি সাধারণ প্যান্ডেল কিন্তু তার আনন্দ- ই ছিল আলাদা। এখনকার ঝাচকচকে প্যান্ডেলে যেন সেই উন্মাদনা   আর অন্তরিকতার ছোঁওয়া তেমন পাই না। তখনকার সাধারণ যেমন তেমন প্যান্ডেল আর তার নিচে সামিয়ানয় অতি সাধারণ ছোট একটি ঠাকুর,তার আকর্ষণ -ই ছিল অন্য রকম।হাজার হাজার বার সেই ঠাকুর দেখেও মনের সাধ মিটত না।সপ্তমীতে কখন প্যাডেলে যাবো ,আগের থেকেই ভাবতে থাকতাম। ষষ্ঠীতে প্যান্ডেল বানানো সম্পূর্ন হত। ছেঁড়া ত্রিপল, বাঁশ,কয়লা, ইটের গুড়ো,কাদা দিয়ে একটা পাহাড় তৈরী হত। সেই পাহাড়ের সামনে দূর্গা প্রতিমা আর পিছনে গাছের ডালপালার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় মহাদেব এর ছবি উঁকি দিত। মহিষাসুর, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও তাদের বাহনদের খুব মনোযোগ সহকারে দেখতাম। সিংহ কে ও দেখতাম কি ভাবে অসুর কে আক্রমণ করার জন্য কেশর ফুলিয়ে আক্রমন করতে উদ্যত হয় আছে, দূর্গা মায়ের পায়ের তলায়। সাপকে কে দেখতাম কেমনকরে মহিষাসুরের দিকে  ফনাতুলে আছে।   হা করে সব কিছু দেখতে থাকতাম।দেখে যেন আর আশ মিটিতো না।


মা 'র ডাকে তাড়াতাড়ি স্নান করে নতুন জামা পরে একটু ও সময় নষ্ট না করে আবার প্যান্ডেলে এসে দাঁড়াতাম।


এখনকার  মতন অনেকগুলো দামী   জামা হত না ঠিকই , মাত্র একটা সস্তা জামা হত। কিন্ত তার আনন্দ ছিল অন্য রকম। চারদিন -ই একই জামা পরতাম,আবার এসে পরিপাটি করে সেই জামাটা ভাজকরে রাখতাম পরের দিনের জন্য। পূজার নতুন জামা গায়ে দিয়ে নিজের জামাটা কে পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জামা বলে মনে হত।পূজা প্যান্ডেলের সামনে সাপুড়েদের মত একরকম বাঁশি বিক্রী হত।দেখতে অনেকটা বিন বাঁশি- র মত। ফু দিলে বাঁশিতে থাকা বেলুনটা ফুলে উঠে বিশাল হয়ে যেত, আর ছেড়ে দিলে প্যা করে শব্দ হয়ে বেলুনটা চুপসে যেত। কিছু পয়সা পেলে রবার ব্যান্ড লাগানো প্লাস্টিকের হাত ঘড়ি নয়তো সানগ্লাস কিনতাম। সানগ্লাস টা পিচবোর্ড দিয়ে দুটো গোলকরে তাতে সামনের দিকের গোল দুটো য় লাল রং এর সেলোফেন কাগজ লাগানো থাকতো। আর পেছনের দিকে থাকতো বড় রবার ব্যান্ড। চোখে পড়লে সারা দুনিয়াটার সব কিছু রঙিন লাগত। নতুন জামার সাতে চশমা পড়লে নিজেকে হিরোইন বলে  মনে হতো।

সবার থেকে নিজেকে সেরা বলে মনে হতো। এছাড়া এক ধরনের ঝুনঝুনি  বেলুন ছিল যে গুলি সর্ষে বা সাবুদানা দিয়ে ফুলিয়ে পাটকাঠির   মাথায় বাধা থাকত। নাড়ালে সেই বেলুন গুলো ঝুনঝুন করে শব্দ করত। অনেক কিছু সাধারণ  খাবার ও পাওয়া যেত,যার স্বাদ ছিল অতুলনীয়। সে গুলি কিনতাম যদি পয়সা থাকত। এসবই ছিল আমার জীবনের তখনকার পূজার সেরা আনন্দ ও দূর্গা পূজার রোজ নামচা। 

পূজার কটাদিন পড়াশুনা থাকত না , মন্ডবে, মন্ডবে শুধুই ঠাকুর দেখা। মজার দিনগুলো বন্ধুবান্ধব দের সঙ্গে কখন যে কেটে যেত বুঝতে পারতাম না,তবে বিজয়ার দিনটা ছিল বিশেষ আনন্দের। দশমীর থেকে শুরু হয়ে যেত সবার বাড়ি বাড়ি যাওয়া। সবই সবার সাধ্য মত নিজেদের বাড়িতে নাড়ু,মোয়া, বোদে ইত্যাদি তৈরী করত। সবাই সবার বাড়িতে মিষ্টি মুখ করতে যেতাম। সেই সব ঘরের তৈরী খাবার এর স্বাদ -ই ছিল আলাদা , ওই সব খাবার জিনিসে একটা আন্তরিকতা, ভালবাসার ছোঁয়া থাকত, কিন্তু এখনকার দোকানের কেনা মিষ্ঠিতে সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া পাই না।


আমার ছোটবেলায় দুর্গাপ্রতিমা বানানো সার্থক হল যখন বনেদি বাড়িতে আমার বিয়ে হল। আমার শ্বশুর বাড়িতে পূর্বপুরুষেরা অনেক দিন ধরেই দুর্গাপূজা করতেন। স্বামীর চাকরিসূত্রে যতদূরে- ই থাকি না কেনো দুর্গাপূজার ওই কয়দিন বাড়িতে চলে আসি।বছরের এই' কটা দিন আমারা সবাই মিলে একত্রিত হই। সবকিছু ভুলে খুব আনন্দ  করি ।চারদিন কোথাথেকে কেটে যায় , বুজতেই পারি না। এরপরে আবার সেই পুরানো জায়গায় ফেরার পালা, সেই একঘেয়ে জীবনযাপন। ছোটদের ও ভালো লাগেনা ,সবাইকে ছেড়ে গিয়ে আবার সেই পুরানো রুটিনে ফেরা।



তবুও সবকিছুর মধ্যে ও আমার মনে সেই শৈশব জীবনের স্মৃতি গুলো মাঝে মধ্যে- উঁকি মরে; চেষ্টা করেও ভুলতে পারিনা যেন।

শৈশবের ছোট প্যান্ডেলে প্রতিমায় যে আন্তরিকতার ছোঁয়া  ছিল,আজ মুঠো ফোনের যুগে সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া আর  নেই। এখন বড় প্যান্ডেল,বড় বড় প্রতিমা, বড় ঝাড়বাতি,রকমারি ঝলমলে লাইটে প্রতিযোগিতার সুর, মাইকের আওয়াজ প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে কেবল সেলফি তোলার হিড়িক। কে প্রথম  হবে - আলো , প্যান্ডেল, প্রতিমায় তার প্রতিযোগিতা সবার মধ্যে চলছে।কিন্তু বাড়ির পূজাতে এখনো সেই বনেদিয়ানা আছে।

শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু হারিয়ে গেলেও তবুও  আমরা অপেক্ষা তে থাকি সারাবছর,আবার কবে দুর্গাপূজা আসবে,কবে আমরা আবার একসাথে হয়ে আনন্দ করতে পারব। হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি নাইবা আঁকড়ে থাকলাম, পুরোনো ভুলে যুগের সংগে তাল মিলিয়ে নতুনকে আমরা স্বাগত জানাবো। সেইজন্যে আবার একবছর আমার সকলে অপেক্ষায় থাকি,কখন দুর্গাপূজা আসবে , আমরা মাকে বরণ করব,আনন্দ করব, বাচ্চাদের সংগে খুশিতে মাতবো। তাইতো হিংসা, বিদ্বেষ ভুলে প্রতিবছর সবাই বলি -"  দূর্গা মা কি জয়, আসছে বছর আবার হবে";---

Comments